বার্লিনে বায়োস্কোপ ৭

ঝিঁঝি পোকার ডাক আর বাংলাদেশের র‍্যাপ


বিধান রিবেরু
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৫, ০৪:১৬ পিএম
ঝিঁঝি পোকার ডাক আর বাংলাদেশের র‍্যাপ
বার্লিন থেকে বিধান রিবেরুর জার্নাল

উৎসবের চতুর্থ দিনটি আমার জন্য উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে থাকবে। এদিন আমি যে বিভাগের জন্য বিচারক নিয়োজিত হয়েছি, সেই পার্সপেক্টিভস বিভাগে প্রদর্শিত হয় বাংলা ছবি। বাংলা ভাষার ছবি। এবং এই ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশী কণ্ঠশিল্পীর গান। বলছি ৭৫তম বার্লিনালে পার্সপেক্টিভস সেকশনে অফিশিয়ালি সিলেক্টেড ছবি ‘বাক্সবন্দী’ (২০২৫) বা ‘শ্যাডো বক্সে’র কথা। 


ছবিটি আমি বিকাল সাড়ে তিনটায় ব্লুম্যাক্স থিয়েটারে দেখতে বসি। তনুশ্রী দাস ও সৌম্যানন্দ শাহীর যৌথ পরিচালিত ছবিটি শুরুই হয় ঝিঁঝি পোকা আর ব্যাঙের ডাক দিয়ে। মফঃস্বলের পটভূমি। একটি ছোট পরিবার: স্বামী-স্ত্রী-পুত্র। স্বামীর নাম সুন্দর, সাবেক সেনা সদস্য, কিন্তু কোনো এক দুর্ঘটনায় তার মানসিক বিপর্যয় ঘটে। এরপর থেকে পুরোপুরি স্ত্রী মায়ার উপর নির্ভরশীল। তবে মাঝে মাঝে সে ব্যাঙ ধরতে বের হয়, সেগুলো ধরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানের ক্লাসে সরবরাহ করে। আর ছেলে দেবু কিশোর, স্কুলপড়ুয়া। সুন্দর অবাঙালি বলে তাকে বিয়ে করতে বেগ পেতে হয়েছিল মায়ার। বিশেষ করে পারিবারিক বাধা ছিল। আর পরে সুন্দর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে, সংসার নিয়ে গোটা দুনিয়ার সাথে লড়তে হয় মায়াকে। মায়ার একমাত্র ছেলে দেবু র‍্যাপ গানের সাথে নাচ অনুশীলন করে। আর এখানেই শোনা যায় বাংলাদেশের গল্লিবয়খ্যাত তবীব মাহমুদ ও রানা মৃধার গলা। ‘শুধু টাকার জন্য’ গানটি ছবির দর্শক শুনতে পায় একদম শুরুতেই। এরপর বারবারই শোনা গেছে বাংলাদেশী র‍্যাপারের গলা। 


ছবি শেষ হওয়ার পর বার্লিনালের প্রোগ্রামার মীনাক্ষী শেড্ডির সঞ্চালনায় একটি প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন তনুশ্রী ও সৌম্যানন্দ। এই জুটির একটি প্রামাণ্যচিত্র অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। তো এবার তারা প্রথমবারের মতো কাহিনিচিত্র বানালেন। জানালেন, তাদের নিজস্ব যাপিত জীবনের প্রতিফলন শুধু নয়, এই ছবিটি তাদের জন্য ছিল আরোগ্যলাভের একটি চমৎকার প্রক্রিয়া। আমার কাছে সিনেমাটিকে মনে হয়েছে, নারীর ভালোবাসার শক্তি ও সংগ্রামের দৃঢ়তা নিয়ে এক অপূর্ব আখ্যান। মায়া চরিত্রে কি দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিলোত্তমা সোম। তিনিও প্রশ্নোত্তর পর্বে সামিল হন। আলাপকালে কথা ওঠে ছবিটির নারীবাদ নিয়ে, উত্তরে তনুশ্রী বলেন, নারীবাদ আছে কি না জানা নেই, তবে সংসারে আমাদের চারপাশে এত এত নারী যে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন, স্বামী ও সন্তানের জন্য, তাদের এই বিপুল শ্রমের বিষয়টি আসলে কারো নজরে আসে না। তারা নিভৃতে এই কাজটি করে যান। এই ছবিটি তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা বলে। 


ছবিতে বাংলাদেশী র‍্যাপারের গান ব্যবহার প্রসঙ্গে পরিচালকদ্বয় জানান, দেবু যেহেতু ছোট আর একধরনের বিদ্রোহীভাব তার ভেতর রয়েছে তাই র‍্যাপ গান ব্যবহারের কথা ভেবেছেন তারা। মানসিক ভারসাম্যহীন বাবার অভিভাবক হয়ে ওঠে দেবু। বাবার জন্য বন্ধু ও সামাজিক নানা চাপও তাকে সামলাতে হয়। তাই র‍্যাপসংয়ের মতো দ্রোহীভাবের সঙ্গীতকে তারা বেছে নিয়েছেন। তাছাড়া গল্লি বয় রানাও যেহেতু ছোট মানুষ, তাই তার গাওয়া গানকে বেছে নেওয়া হয়। দেবু চরিত্রে সুন্দর অভিনয় করেছে সায়ান কর্মকার। বিশেষ করে শেষের দৃশ্যে নাচের মুদ্রা থেকে ধীরে ধীরে লংশট থেকে ক্লোজশটে এসে বক্সিং অনুশীলনের ব্যাপারটা। দণ্ডপ্রাপ্ত বাবা আর অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালানো মায়ের সংসারে এক লড়াকু ছেলে সে। 


প্রশ্নোত্তর পর্ব যখন দর্শক সাড়িতে গড়াল, আমি নিজেকে নিয়ে দৌড়ালাম হায়াত হোটেলের দিকে। কারণ আমাদের চলচ্চিত্র সমালোচকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ফিপ্রেসির এক অনানুষ্ঠানিক বোর্ড মিটিংয়ের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির জেনারেল সেক্রেটারির পদ থেকে প্রায় চার দশক পর ক্লাউস এডের বয়সজনিত কারণে পদত্যাগের পর এটির হাল ধরবে কে এবং সেটা কিভাবে ধরবে, তা নিয়েই বৈঠক। আমি আধ ঘন্টা দেরিতে ঢুকলাম মিটিংয়ে। ওদের জানানো ছিল, যে আমার স্ক্রিনিং আছে। ঢুকে দেখি খুবই বয়োজ্যেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ সব সদস্য। বার্লিনে মোটামুটি যারা ছিলেন, বা যারা বিভিন্ন দেশ থেকে বার্লিনালেতে এসেছেন তাদের প্রায় সবাই এসেছেন। সকলের আলাপ যখন শেষের দিকে, তখন আমি বড় ফেস্টিভালগুলোতে ফিপ্রেসির ভিজিবিলিটি বাড়ানো নিয়ে কথা বললাম। সবাই দেখলাম একমত হলেন। মিটিং শেষ হওয়ার পর বুঝলাম, ফেস্টিভাল সার্কিটে বাংলাদেশ মানে আহমেদ মুজতবা জামাল। তিনি বাংলাদেশের পোস্টার বয়। ফিপ্রেসির ট্রেজারার থেকে শুরু করে অন্য অফিশিয়ালরা আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আহমেদ কেমন আছেন? বললাম, তিনি ভালো আছেন। উৎসব নিয়েই সারাবছর ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়।


তো সবার সাথে মোটামুটি পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। আমার পরবর্তী স্ক্রিনিং রাত সাড়ে নয়টায়। বিদায় নিয়ে বের হলাম বোর্ডরুম থেকে। ঘড়িতে সোয়া সাতটা। অনেক সময়। ডিনার সেরে নেয়া যায়। এরপর বসে বসে ফেস্টিভাল উপলক্ষ্যে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো থেকে রিভিউ পড়া যাবে। মলের ভেতর গিয়ে আজ পা থমকে দাঁড়ালো ভেনিজুয়েলার খাবার বিক্রি করে এমন এক দোকানের সামনে। ‘পুলড পর্ক’ নামের এক খাবার নিলাম। সাদা বনের ভেতর মাংস, সাথে গ্রিন সস। খাওয়াদাওয়া সেরে সোজা গ্র্যান্ড হায়াতে গিয়ে ম্যাগাজিন পড়লাম অনেকক্ষণ। সময় গড়ালে একটু ঝিমিয়ে নিলাম। তারপর আবার স্ক্রিনিংয়ে। এই ছবিটিও পার্সপেক্টিভস সেকশনে। অস্ট্রিয়ার ছবি ‘হাউ টু বি নরমাল অ্যান্ড দ্য অডনেস অব দ্য আদার ওয়ার্ল্ড’, পরিচালকের নাম ফ্লোরিয়ান পোচলাকতো। 


ডার্ক কমেডি ও সাইকোড্রামা ঘরানার ছবিটিতে দেখা যায় ২৬ বছর বয়সী তরুণী পিয়া, মানসিক হাসপাতাল থেকে সদ্য ছাড়া পেয়ে বাড়ি এসেছে। ভিয়েনার একপ্রান্তে সে তার বাবা-মায়ের সাথে থাকতে গিয়ে আবিষ্কার করে, শুধু সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নয়, বাবা ক্লাউস ও মা এলফিও এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। পিয়া তার বাবা-মাকে উদ্ধারের চেষ্টা করে, কিন্তু নিজস্ব পদ্ধতিতে। সে কল্পনায় নিজেকে এক বিশালাকার দানবে পরিণত করে, তারপর সব সমস্যাকে নির্মূল করতে চায়। কিন্তু চারপাশের লোকজন বলে এটা স্বাভাবিক নয়। পিয়ার কাছে তো উল্টো তাদেরকে অস্বাভাবিক লাগে। বাবার অফিসে যারা বিজনেস ডিলে আসে তাদের লাগে জোকারের মতো। বাইরের অন্যসব লোকজনদের তার মনে হয় ম্যাট্রিক্স সিনেমার সেই খলনায়ক এজেন্ট স্মিথের মতো। সে এই অস্বাভাবিকতা থেকে পালাতে চায়, ভিন্ন কোনো মহাবিশ্বে। শেষ পর্যন্ত পিয়া পালিয়েই যায়, চিরতরে। 


পরিচালক যেভাবে পিয়ার মানসিক দুনিয়াকে চলচ্চৈত্রিক ভাষায় রূপ দিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। ভিজুয়াল টেকনিক যেভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন, তা দর্শককে মুগ্ধ করে রাখে। আর সংলাপ ও চিত্রনাট্যের ভেতরে হাস্যরস ছিল, রাজনীতি মনস্কতা সেখানে প্রমাণিত। বিশেষ করে ওই দৃশ্যটি—বেতারে মানবতাবিরোধী অপরাধের খবর প্রচার হচ্ছে, পাশাপাশি মা এলফি অস্থির হয়ে ওঠে ও দুর্ঘটনা ঘটে। এই দৃশ্যটি বেশ মুন্সিয়ানার সাথে ধারণ করা হয়েছে। ছবি শেষ হতে হতে সাড়ে এগারো প্রায়। এত ঘুম পাচ্ছিল, কেমন করে এই ঠাণ্ডা ঠেলে ট্রেনে চড়ে বাসা অব্দি পৌঁছাব, সেটা ভাবতেই আরো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। কিছু করার নেই। ফিরতে হবেই। 

 

ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, আজ সকালে এসে আমার কো-জুরি সারার সাথে আলাপ করছিলাম, বাংলাদেশেও অনেক ভালো ভালো প্রজেক্ট হচ্ছে। আমাদের এখন ভীষণরকম দরকার ট্রান্সন্যাশনাল ফিল্ম। মানে অনেক দেশের প্রযোজককে যুক্ত করতে হবে। যেমন ‘বাক্সবন্দী’ ছবিটি কলকাতার বাংলা ছবি হলেও, এর সাথে ভারত ছাড়াও প্রযোজনা করেছে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের প্রযোজকগণ। চিন্তা করে দেখলাম, আমাদের নৌকা আছে, মাঝি আছে, মাঝির হাতে বৈঠাও আছে, এখন শুধু পাল তোলা দরকার।

Link copied!