দুপুর বারোটা অব্দি লেখালেখি করে, গায়ে প্রচুর জামাকাপড় জড়িয়ে গেলাম সেই তুর্কি রেস্তোরাঁয়। গিয়ে গেমিশতার জালাত (Gemischter Salat) দিতে বললাম ছোট বাটিতে। ওই ছোট বাটিতেই যে পরিমাণ দিল সেটি খেতে খেতে কাহিল দশা। শসা, টমেটো, বিট, পেঁয়াজ ইত্যাদির সাথে যেভাবে পনির, দই, সরিষা মাখিয়ে দেয় খেতে ব্ড্ড সুস্বাদু লাগে। দাম তিন দশমিক আশি ইউরো মাত্র। তো খেয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখি ট্রেন আসবে একুশ মিনিট পর। এই ঠাণ্ডার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর। ছোট স্টেশন হওয়ার কারণে সেভাবে এটি আবদ্ধ নয়। শীতের বাতাস হুহু করে একপাশ দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে টানেলের অন্যপাশ দিয়ে। আমি শীত কমাতে পায়চারি করতে শুরু করলাম।
ঠাণ্ডায় যখন জমে বরফ হওয়ার দশা তখন ট্রেন এল। আমি ছুটে গিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ট্রেন জার্নিটা সংক্ষিপ্ত হলেও বেশ সুন্দর। জানালার বাইরে ধূসর বরফ। একটা বিষণ্ণ কিন্তু সুন্দর সুর বাজে যেন, সেবাস্টিয়ান বাখ ছাড়া আর কে হতে পারে এই বৈপরীত্যকে ধারণ করতে পারে! আট থেকে নয় মিনিটের ভেতরেই আমি গন্তব্যে পৌঁছে যাই। আজ বেশি আগে আসিনি। মাত্র এক ঘন্টা আগে। ইচ্ছা আছে মার্চেন্ডাইজগুলো দেখব। তো ওদের অফিশিয়াল লোকজনই জানে না কোথায় মার্চেন্ডাইজ বিক্রি করছে, আমাকে এখানে সেখানে ঘুরিয়ে তারপর পাঠাল ঠিক জায়গায়। প্রথমদিন আসা শপিং মলটার ভেতরেই একটা দোকান নিয়ে বসেছে ওরা। আমি গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে যখন আর মাত্র দুজন আছে সামনে, তখন আসলে আর দাঁড়িয়ে থাকা গেলো না, কারণ পৌনে দুটায় স্ক্রিনিং শুরু হবে। হাতে আছে চার মিনিট।
১৩ ফেব্রুয়ারি আমার দেখা প্রথম ছবি ‘গ্রোয়িং ডাউন’ (২০২৫), হাঙ্গেরিয়ান ছবিটির পরিচালক বালিয়ান্ত দানিয়েল শশ। সাদাকালো ছবিটি পিতা ও পুত্রের মানসিক দ্বন্দ্বের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছে। বিপত্নীক সান্দোরের ছেলে দিনেশ, একটু আত্মবিশ্বাস কম, চাপা প্রকৃতির। সান্দোর লিভ টুগেদার করে যার সাথে তারও রয়েছে একটি সমবয়সী মেয়ে, নাম সারি। সারি একটু চঞ্চল স্বভাবের। সে সবসময় দিনেশকে উত্যক্ত করে। একদিন খেলাচ্ছলে সারি সুইমিং পুলে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় এবং কোমাতে চলে যায়। পাশেই ছিল দিনেশ। সান্দোর দেখে ফেলে ঘটনাটি। তাহলে কি ছেলেই তার সৎ মেয়ে সারিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে? ছেলেকে বাঁচাবে, না সত্যটা বলবে? দিনেশও দ্বিধান্বিত, ও পা বাড়িয়ে সামনে গিয়েছিল বলেই কি সারি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল? সৎ মা ক্লারাও এক মানসিক টানাপোড়েনের ভেতর পড়ে যায়। দিনেশ তার গর্ভের সন্তান নয়। কিন্তু ছোট মানুষ। তার উপর কি দোষ চাপানো যায়? এমন এক মনোজাগতিক সঙ্কট নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে দৃশ্যের ভাষাকে অপূর্ব করে ব্যবহার করেছেন পরিচালক। প্রথম ছবিতে তিনি যথেষ্ট পরিপক্কতার ছাপ রেখেছেন।
এই ছবিটি শেষ হতে না হতেই আমি ছুট দিলাম মার্চেন্ডাইজের দোকানে। সেখান থেকে স্মৃতিস্মারক কিনে আবার হাপাতে হাপাতে ব্লুম্যাক্স থিয়েটারের বিশাল প্রেক্ষাগৃহে ঢুকলাম। কম করে হলেও সাতশ লোকের বসার সংকুলান হয় এখানে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে আবার সেই একই আসনের কাছাকাছি চলে গেলাম। যেখানে বসে আগের ছবিটি দেখেছি। গিয়ে দেখি এক সারি পেছনে বসে আছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের নামকরা পরিচালক অনুরাগ কশ্যপ। আমি ঠিক তার সামনেই বসলাম। ছবি শুরু হলো।
‘দ্য ডেভিল স্মোকস’ (২০২৫), মেক্সিকান ছবিটির পরিচালক আর্নেস্তো মার্তিনেজ বুসিও। পাঁচ ছেলেমেয়েকে রেখে মা একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তাকে খুঁজতে গিয়ে বাবাও লাপাত্তা। ভাইবোনগুলো থাকে দাদির জিম্মায়। বুড়ো মানুষ আর ছেলেমেয়েগুলো প্রতিবেশীর সঙ্গে জড়িয়ে যায় সংঘাতে। ওদিকে টিভিতে অবিরত পোপ দ্বিতীয় জন পলের আসার খবর প্রচার হচ্ছে। ভাইবোনদের একজন প্রবল প্রত্যাশা করছে পোপ তাদের আশীর্বাদ করবেন, তাদের পরিবার আবার আগের মতো আনন্দময় হয়ে উঠবে। কিন্তু সে আর হয় না। পরিবারের আরেক ছোট ছেলে বিতশ্রদ্ধ হয়ে ভরসা চায় শয়তানের কাছে।
শিশুতোষ ছবিটাতে দৃশ্য বয়ানে চমক থাকলেও ছবিটির কোনো লক্ষ্য নেই। কেমন যেন দিকভ্রান্ত জাহাজের মতো ভেসে চলে। দর্শক হিসেবে আমি অর্ধৈয্য হয়ে উঠছিলাম। এক ঘন্টা পর দেখি অনেক মানুষই আসন ছেড়ে উঠে চলে যাচ্ছে। এমনকি অনুরাগ কশ্যপও দেখলাম তার সঙ্গীনিকে নিয়ে উঠে চলে গেলেন। আমি উঠে যাব কি না ভাবছিলাম। এই ছবি যদি পার্সপেক্টিভস সেকশনে না থাকত তাহলে উঠে যেতাম নিশ্চিত। কিন্তু বিচারকর্মের খাতিরে পুরোটা দেখতে হলো। ডেব্যু ফিল্ম হিসেবে বুসিও দৃশ্যের বুনোটটা ভালো করেছেন, হ্যান্ডি ক্যামেরার ফুটেজ, ফাস্ট ফরোয়ার্ড, ক্লোজ শটে সাবজেক্টকে অনুসরণ ইত্যাদির ব্যবহার প্রশংসার দাবি রাখে। তবে তিনি গল্পটা বড্ড দুর্বল গল্প বেছে নিয়েছেন বলে বোধ হলো।
ছবি দেখে বেরিয়ে আসছি, দেখি আমার জার্মান বন্ধু এক্সেল টিমো-পার, সেও এই ছবি দেখে বেরিয়েছে। এরপর দুজন মিলে ছবির পিণ্ডি চটকে পাশের মলে গিয়ে বসলাম। ছবিটবি তুললাম। এরপর সেদিনকার মতো বিদায় জানালাম। দেখা তো হবেই এই কদিনে আবার। তারপর আবার দৌড়, আর দশ মিনিটের ভেতর তৃতীয় ছবি শুরু হবে। এবারের ছবিটি খুবই মিষ্টি একটা ছবি। একই জায়গায়, স্টেজ ব্লুম্যাক্স থিয়েটারে। ফরাসি ছবি ‘দ্যাট সামার ইন প্যারিস’, ভ্যালেন্তিন কাদিকের প্রথম ছবি। ত্রিশ বছর বয়সী ব্লঁদিন এসেছে প্যারিসে অলিম্পিকসে সাঁতারের ইভেন্টগুলো দেখতে, সেই সুদূর নরম্যান্ডি থেকে। রথ দেখা ও কলা বেঁচা দুই ইচ্ছা নিয়ে সে প্যারিসে এসেছে। অলিম্পিকের পাশাপাশি তার ইচ্ছা সৎবোনটিকেও একটু দেখে যাবে। তাদের বাবা আলাদা, কিন্তু মা এক। অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই।
প্যারিসের মতো জটিল একটি শহরে এসে সে দেখল, অলিম্পিক নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ দ্বন্দ্ব। বোন ও বোনের স্বামী দুজনই ঝঞ্ঝামুখর দিন যাপন করছে। কিছু মানুষ রাতদিন খেটে যাচ্ছে, তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। ডর্মে থাকতে গিয়ে সে দেখে ঘিঞ্জি জায়গায় কতশত মানুষের আনাগোনা। হট্টগোল। এরচেয়ে তার নরম্যান্ডির শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশই ভালো। ব্লঁদিন নিজেও অতো জটিল নয়। সরলসোজা এক মেয়ে। নগর আর নাগরিক জীবনের চাপ আর না নিতে পেরে অলিম্পিক ফেলেই সে ফিরে যায় নিজের জায়গায়। ছিমছাম গল্পে, হাস্যরস আছে, রাজনৈতিক সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে, সব মিলিয়ে খারাপ লাগেনি ছবিটি।
শো শেষ করে ফিরছি, মলের ভেতর দিয়ে, কারণ বাইরে দিয়ে হাঁটার কোনো মানে নেই, তুষারপাত হচ্ছে। দেখি মলের ভেতরে বিশাল স্ক্রিনে চলছে ৭৫তম বার্লিনাল ওপেনিং সেরেমনি। লোকজন সামনে পাতা আসনে বসে সেটি দেখছে। ‘রান লোলা রান’, ‘হেভেন’, ‘পারফিউম: দ্য স্টোরি অব আ মার্ডারার’খ্যাত জার্মানির টম টাইকওয়ার পরিচালিত ‘দ্য লাইট’ এবারের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র। উদ্বোধন শেষেই ছবিটি দেখানো হবে। জার্মানিতে সিরিয়ার এক শরণার্থীর গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। ভুলে গেলে চলবে না ২৩ ফেব্রুয়ারি জার্মানিতে জাতীয় নির্বাচন। আর এবারের নির্বাচনে অভিবাসী ও শরণার্থী বিষয়টি ঘুরেফিরে আসছে। এই আসরে স্বর্ণভল্লুক জেতার জন্য মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়বে ১৯টি চলচ্চিত্র। ‘দ্য লাইট’ অবশ্য প্রতিযোগিতার বাইরে।
এবার ফেস্টিভাল ডিরেক্টর ট্রিসিয়া টাটলের প্রশংসা করছে সবাই। তিনিই নাকি বার্লিনালের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে এনেছেন। টম টাইকওয়ারের ছবি দিয়ে উৎসব শুরু করেছেন। বং জু-হোর ছবি ‘মিকি সেভেনটিন’ এনেছেন। বং জু-হ অস্কার পাওয়ার পর এটাই্ প্রথম ছবি। বব ডিলানের বায়োপিক ‘আ কমপ্লিট আননোউন’ এনেছেন। মানে এবারের উৎসবের প্রোগ্রামিং ভালো শুধু নয়, আকর্ষণীয়ও হয়েছে। এছাড়া উদ্বোধনী দিনে আজীবন সম্মাননা স্মারক হিসেবে স্বর্ণভল্লুক দেয়া হয়েছে প্রখ্যাত স্কটিশ অভিনেত্রী টিল্ডা সুইনটনকে।
উৎসবকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ উদ্দীপনা যেমন আছে, তেমনি রাজনীতির পারদও কিন্তু কিঞ্চিত উঠানামা করছে। যেমন- মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি আগ্রাসনের জন্য কেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সকলের সামনে সমালোচনা করছে না বার্লিনাল, সেজন্য উৎসব বয়কটের ডাক দিয়েছে ফিলিস্তিনপন্থী একটি দল। যাদের আমরা দেখেছিলাম ১১ ফেব্রুয়ারি ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে। তো উদ্বোধনী দিন আবার বার্লিনালের রেড কার্পেটের অদূরেই কিন্তু ইসরায়েলপন্থীদের একটি দল সমবেত হয়েছিল।
তবে বার্লিনাল তার মতো করেই উদযাপন করছে উৎসবটি। ১৩ থেকে ২৩, এই এগারো দিন উৎসবে অংশ নেবে দেড় শতাধিক দেশের প্রতিনিধি। ইউরোপের অন্যতম এই উৎসবকে প্রচণ্ড শীত কাবু করতে পারছে না। বরং উল্টো উত্তাপ ছড়াবে বলেই মনে হচ্ছে।