বার্লিন নিয়ে স্লোভেনিয়ার দার্শনিক স্লাভয় জিজেক একবার কৌতুক করে বলছিলেন—কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কোথায় থাকতে চাই, তাহলে আমার উত্তর হবে: পূর্ব বার্লিনে থাকতে চাই, ১৯৭৫ সালে ফিরে গিয়ে হলেও। ওখানে সমাজতন্ত্র চলছে তখন, তবে পশ্চিম বার্লিনের সব মালামালই পাওয়া যেত পুব দিকে, সীমান্তের এপার আর ওপার। সাম্যবাদ আর পুঁজিবাদ নিয়ে জিজেকের এই কৌতুকটি আজ ভিন্ন হয়ে ধরা দিল আমার কাছে। বার্লিনালে আমার কাজ দুপুরের পর থেকে। দুপুরের আগে তাই ঠিক করলাম শহরের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকানে যাব। দোকানটি ফ্রিডরিকস্ট্রস এলাকায়। ধর্মঘট চলছে ট্রেনের ইউ লাইনে। আমি ওরানিয়ানবুর্গমুখী এস-ওয়ান লাইনের ট্রেনে চড়ে পটসডেমার প্লাৎজ পেরিয়ে, মাঝে ব্রান্ডেনবুর্গ টর স্টেশন বাদ দিয়ে এসে নামলাম ফ্রিডরিকস্ট্রস স্টেশনে।
পাতাল থেকে ওপরে উঠেই বোঝা গেল এই অংশটি একদা পূর্ব জার্মানি ছিল। ভবনের নকশা অনেকটা যেন সোভিয়েত জমানার মতো। ‘ডুসমান’ (Dussmann das KulturKaufhaus) নামের যে বইয়ের দোকানে আমি এসেছি, সেই স্থানটিতে যদি আমি সত্তরের দশকে আসতাম, তখন আমাকে ‘দুশমন’ বলে ধরে নেওয়া হতো, যেহেতু পশ্চিম থেকে এসেছি। এসেছি তো খালি হাতে, কিন্তু ফেরার সময় ব্যাগ দুশো মণ ওজন করে ফিরতে হয়েছে। প্রচুর বইটই কিনেছি। আরও কিনতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু এত তো বহন করা মুশকিল!
‘ডুসমান’ বইয়ের দোকানটিতে ঢুকে আমার চক্ষু ছানাবড়া বললেও কম বলা হবে। মানে কমপক্ষে কুড়ি হাজার বর্গফুটের ওপর বহুতলা ভবন। তার দুটো তলার পুরোটাই বইপত্রে ঠাসা। এক কোনায় অবশ্য অডিও লংপ্লে ডিস্কও আছে। নিচের তলাটি পুরোপুরি জার্মান ভাষার জন্য। আর ওপরে নব্বই শতাংশই ইংরেজি বই। দশ ভাগে রাখা আছে স্প্যানিশ, আরবি, ফরাসি ইত্যাদি ভাষার বই। প্রত্যেকটা বিভাগ এত সুন্দর করে গোছানো! ওখানে ঢুকলে আর বের হতে ইচ্ছে করে না। দোতলায় গিয়ে আমার চোখে পড়ল ‘মিডিয়া অ্যান্ড এআই’ বিভাগটিতে। সেখানে গিয়ে দেখি মিডিয়া নিয়ে দুখান বই, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বই উপচে পড়ছে। আমি দোকানিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, এআইয়ের বই দিয়ে ভর্তি। সিনেমার বই কোথায় পাব? মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল, সিনেমার বই পেতে চাইলে পপুলার সেকশনে চলে যাও।
আমি জলদি জলদি ওই বিভাগে গিয়ে দেখি চলচ্চিত্র, স্থিরচিত্র, সংগীত, চিত্রকলা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর সমৃদ্ধ সংগ্রহ। কিছু বই আমার কাছে আগে থেকেই রয়েছে। না থাকার ভেতর থেকে সংগ্রহ করলাম পশ্চিম জার্মানির মশহুর চলচ্চিত্রকার রেইনার ভারনার ফাজবিন্দারের ওপর ইয়ান পেনম্যানের লেখা চমৎকার একটি বই। আরেকটি স্যাম ওয়াসনের লেখা মার্কিন চলচ্চিত্রকার ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপোলার জীবনীভিত্তিক বই। দুটি আগে কাউন্টারে রেখে এসে পরে কিছুক্ষণ আঠার মতো আটকে রইলাম দর্শনের বিভাগে। সেখান থেকে কিছু বই বগলদাবা করে চলে গেলাম বাচ্চাদের বইয়ের কাছে। সেখানে দেখি বয়স অনুযায়ী বই সাজানো। মনের জন্য কয়েকটি বই হাতে নিলাম। এরপর পাঠের জন্য পেতে রাখা সোফায় বসে সংগ্রহ করা বইগুলো থেকে কিছু বাদ দিলাম। তালিকা কাটছাঁট করেও দেখি গোটা সাতেক বই। ঘড়িতে সোয়া দুইটা। সাড়ে তিনটার স্ক্রিনিং ধরতে হলে এখনই রওনা দিতে হবে।
কাজেই দ্রুত দাম চুকিয়ে উল্টোরথে চড়ে মিনিট পাঁচেকের ভেতর চলে এলাম ভেন্যুতে। পাতাল থেকে ওঠার সময় সালামি দেওয়া খোয়াজো কিনে খেলাম। এর আগে দুপুরে বইয়ের দোকানে যাওয়ার সময় গ্রিন পাস্তা কিনেছিলাম। জঘন্য খেতে। শেষমেষ ফেলে দিতে হয়েছিল। পাঁচ ইউরো ডাস্টবিনে গেছে আমার! ভাগ্যিস সঙ্গে কলা ছিল। যাহোক, অল্পটুকু পাস্তা, একটা খোয়াজো আর কলা খাওয়ার পর শান্তিতে বসে একটি সিনেমা দেখা যাবে। ভেন্যুতে যখন এলাম তখনো তিনটা বাজেনি। আমি মলে ঢুকে একটু বসেছি। অমনি দেখি দূর থেকে বি-ধা-ন বলে দৌড়ে এলেন মীনাক্ষী শেড্ডি। উনি বার্লিনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি এবং ছবি বাছাই কমিটির সদস্য। আহা, উনি বার্লিনালে এবারের ট্যালেন্টদের নিয়ে একটি ব্রেকফাস্ট পার্টি কল করেছিলেন। আমার যাওয়া হয়নি। দুদিন আগেই ছিল। তো দেখা হয়েই গেল। আমার বইভর্তি ব্যাগ দেখে বললেন, আরে এত্ত বই! দাঁড়াও তোমার কিছু ছবি তুলব, বইসহ। কোনো কথা না শুনে অনেকটা জোর করেই আমার ছবি তুললেন। এরপর দক্ষিণ এশিয়ার কে কোথা থেকে এবার বার্লিনে এসেছে তা নিয়ে আলাপ হলো।
আমাকে বললেন, বাংলাদেশ থেকে তো ‘সাবা’র পরিচালক মাকসুদ হোসেন এসেছে। তুমি তাকে চেনো? আমি বললাম, না ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় নেই। উনি সাথে সাথে ফোন বের করে মাকসুদ হোসেনকে কল করলেন। ওই প্রান্তে ফোন ধরতেই বললেন, বিধান রিবেরু, বার্লিনালে এবারের ফিপ্রেসি জুরি, সিনিয়র রাইটার, ওর সাথে তুমি অবশ্যই দেখা করবে। ইত্যাদি আরো সব প্রশংসা করে ফোন রেখে এবার মাকসুদ হোসেনের প্রশংসা করলেন। বললেন, টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালেও ওর ছবি ‘সাবা’ খুব প্রশংসা কুড়িয়েছে। আমি বললাম, মাকসুদ হোসেনের সঙ্গে আমি অবশ্যই দেখা করব।
[111107]
মীনাক্ষী বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পর দৌড় দিলাম প্রেক্ষাগৃহের দিকে। ব্লুম্যাক্স থিয়েটারে আর মিনিট পাঁচেকের ভেতর শুরু হবে ‘মিনিমালস ইন আ টাইটানিক ওয়ার্ল্ড’ (২০২৫) ছবিটি। রুয়ান্ডা, জার্মানি, ক্যামেরুনের সম্মিলিত প্রযোজিত ছবিটি পরিচালনা করেছেন ফিলবার্ট এইমে মাবাজি শারাংগাবো। রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে বসবাসরত আনিতা নামের এক তরুণীর গল্প বলে চলচ্চিত্রটি। আনিতা সদ্য জেলখানা থেকে বেরিয়ে আবার যোগ দেয় ক্লাবে, সেখানে সে নৃত্য পরিবেশন করে। নাচলেও, তার ইচ্ছা সে একদিন সঙ্গীতশিল্পী হবে। নিজেই গান লেখে ও সুর করে। কিন্তু হঠাৎ করে তার প্রেমিক মারা গেলে, প্রেমিকের বন্ধু শেমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে আনিতা। শেমাকে সে জানায় গায়িকা হতে চাওয়ার বাসনা। বন্ধুদের কাছ থেকে আনিতা সহযোগিতা পেলেও, ক্লাবের মালিক সাহায্যের বিনিময়ে আরো কিছু চায়। আনিতা সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। বন্ধুদের সে বলে, তার সাথে সবসময় এক ফেরেশতা থাকে, যে তাকে সবকিছু থেকে রক্ষা করে। তবে তার ফেরেশতা কৃষ্ণাঙ্গ। পরিচালক এই জায়গাতে পরী, ফেরেশতা বা এঞ্জেল নিয়ে যে কাঠামোবদ্ধ ধারণা রয়েছে মানুষের সেটি ভেঙে দিতে চান। আকাশ থেকে কেউ নেমে এলেই তার গায়ের রং সাদা হবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। কৃষ্ণাঙ্গদের ফেরেশতা কৃষ্ণাঙ্গই হবে। তবে চলচ্চিত্রটি দেখে আমার মনে হয়েছে অভিনয় ও সিনেমাটোগ্রাফিতে আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।
ছবি শেষ হলে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। পরিচালক জানান, তিনি রুয়ান্ডার বর্তমান প্রজন্মের দুঃখ-বেদনাকে ধরতে চেয়েছেন। এটা তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তবে এর আগে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করেছেন। কিছু কথাবার্তা শুনে আমি বেরিয়ে পড়ি গ্র্যান্ড হায়াতের উদ্দেশ্যে। ওখানে আমাদের জুরিদের ডেলিবারেশন মিটিং। আজই চূড়ান্ত হবে কে হচ্ছে পার্সপেক্টিভস সেকশনের ফিপ্রেসি বিজয়ী। আমি হোটেল লবিতে ঢুকতেই দেখি এক লোক হাত নাড়ছে আমার দিকে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর বুঝতে পারি লোকটি মোহম্মদ সায়িদ আবদেল রহিম। মিশরের ফিল্ম ক্রিটিক। রহিম আমার ফিপ্রেসি কো-জুরি ছিলেন ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের কুড়িতম আসরে, ২০২২ সালে। আমি সামনে গিয়ে বললাম, কি খবর তোমার? জানালো, বার্লিনালে ও এসেছে কায়রো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালের হয়ে। ওই উৎসবের ইন্ডাস্ট্রি ডেইজের প্রধান ও। অর্থাৎ কায়রো উৎসবের ফিল্ম বাজারটা ও দেখে। রহিমের সঙ্গে একজন জার্মান সাংবাদিক ছিলেন। আমরা অনেকক্ষণ নানা বিষয়ে কথা বললাম। বিশেষ করে এবারের বার্লিনাল নিয়ে। ফান্ড সংকট, বিশ্ব রাজনীতি, ফিলিস্তিনের পক্ষে যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের ব্যাপারে। ওদের সাথে কথা বলতে বলতেই দেখা গেল ইতালির কো-জুরি সারা চলে এসেছে।
আমরা জুরি মিটিংয়ের জন্য উপরে চলে গেলাম। দীর্ঘ দেড় ঘন্টা বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হলো কোন ছবিটি হচ্ছে বিজয়ী। এত সময় লাগার কারণ এবারের পার্সপেক্টিভস সেকশনে ভালো ছবির সংখ্যা ছিল বেশি। কোনটা রেখে কোনটাকে পুরস্কার দেবো! দুই একটা বাদে সব ছবিই তো দারুণ! প্রত্যেকে নিজেদের শীর্ষ তিন ছবির তালিকা দেয়ার পর, সেগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে একটা ঐকমত্যে পৌঁছাই আমরা। এরপর শুরু হয় ছবিটিকে কেন আমরা পুরস্কার দিচ্ছি সেটি লেখার কাজ। তিনজনে মিলে লিখে চূড়ান্ত করার পর আমরা কর্তৃপক্ষকে একটা মেইল করি, বিজয়ী ছবির বিস্তারিত জানিয়ে। কাজ কিন্তু শেষ হয়নি। পুরোপুরি শেষ হবে ২২ ফেব্রুয়ারি পুরস্কার ঘোষণা ও বিজয়ীকে ডিপ্লোমা প্রদানের ভেতর দিয়ে।
তো অষ্টম দিনের জন্য কাজ শেষ। আমি বাসার পথ ধরি। পিঠে বইয়ের বোঝা। এই বোঝা বহন করতে আমার চিরকালই ভালো লাগে। দেশে বইমেলা চলছে। সেখানে থাকলেও মেলা থেকে এভাবে বই বহন করে বাড়ি ফিরতাম। ভাবছিলাম, ডুসমান বইয়ের দোকানটার কথা। সেখানে অন্য ভাষার বইকেও যেভাবে গুরুত্ব সহকারে রাখা হয়েছে তা প্রশংসনীয়। তবে এক তলার পুরোটাই কিন্তু জার্মান ভাষার বই। অর্থাৎ মাতৃভাষাকে ওরা অধিক গুরুত্ব দেয়। এটা বোঝা যায় ওদের শিক্ষাব্যবস্থা দিয়েও। তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলে বাচ্চাদের ইংরেজির সাথে পরিচয় ঘটানো হয়। আর পঞ্চম শ্রেণি থেকে ইংরেজিকে বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। আগে ওরা বাচ্চাকে মাতৃভাষায় পোক্ত করে। আর আমরা কেজি বা কিন্ডারগার্টেনেই (এই শব্দটা জার্মান শব্দ, আমরা দিব্বি বাংলা অঙ্কুর-কিশলয়-মঞ্জরি এগুলো ভুলে গিয়ে বলছি কেজি ওয়ান, টু, থ্রি) বাচ্চাকে দুই-আড়াই বছর বয়সে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছি ইংরেজি মাধ্যমে। যেখানে আবার বাংলা বলা নিষিদ্ধ। এই আমরাই আবার একুশে ফেব্রুয়ারি এলে বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার কথা বলে হাহাকার করি। এ রকম ভণ্ডামির কারণে আমাদের বাচ্চারা না শেখে বাংলা ভালো করে, না শেখে বিদেশী ভাষা। আমরা শুধু জানি, শাসক পরিবর্তিত হলে অধ্যায় কি করে পাল্টে দিতে হয়। গোটা শিক্ষাব্যবস্থা, মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে কিভাবে সাজানো যায়, সেই সুদূরপ্রসারী নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এখনো আমরা অর্জন করতে পারিনি।